বাঙালিমাত্রই ফুটবলপ্রেমী। সেই প্রগাঢ় প্রেম কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় মন সঁপে দেয়? নয়াদিল্লি থেকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কে যে কখন কীভাবে কার ভালোবাসায় পড়ে, আজও তার কোনো ছকবাঁধা ফর্মুলা কেউ জানাতে পারেনি। যেমন আমিও জানি না, প্রথমে ফুটবল, তারপর মোহনবাগান এবং ক্রমে ক্রমে একদিন কীভাবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ভালোবাসার জালে-পড়া মাছের মতো আটকা পড়েছি!
সেই কোন ছেলেবেলায় গ্রামের বাড়ির উঠোনে গাছ থেকে পাড়া ইয়া বড় এক বাতাবিলেবু (জাম্বুরা) হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের যৌথ পরিবারে ভাইদের ফুটবল। ঘোর বর্ষায় থইথই উঠোনে সেই ‘বল’ পেটাপেটি পর্বের শেষ পাতে ছিল গুরুজনদের কান মলা। বোধোদয়েরও সেই শুরু। জেনেছিলাম, বাতাবিলেবু আর যা-ই হোক, ফুটবল হতে পারে না কিছুতেই। পরের হাটবারে ভাগ্যে জুটেছিল ফুটবল। সেই যে হাত বাড়িয়ে ফুটবল আঁকড়ে ধরা, তাকে হটিয়ে আর কোনো খেলা আমার ভালোবাসায় কখনো থাবা মারতে পারেনি।
গ্রাম থেকে কলকাতায় আসার পর ফুটবলটা ঠিক কীভাবে খেলে কিংবা খেলা উচিত, সেই শিক্ষা প্রথম পাই অমল দত্তের কাছ থেকে। পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতীয় ফুটবলে অমল দত্ত অতিপরিচিত এক নাম। শৈশব-কৈশোরে স্রেফ ওটুকুই জানা ছিল। পরে তিনি কলকাতার বড় দলগুলোর কোচ হয়েছিলেন। সাফল্য-ব্যর্থতা দুয়েরই স্বাদ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারও অনেক আগে, আমরা যখন কিশোর, সেই সময় অমল দত্ত পাড়ার ক্লাবগুলোতে যোগাযোগ করতেন। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তিনি দেখাতেন, ফুটবলটা আদতে কেমন খেলা। কীভাবে ওই খেলাটা খেলতে হয়।
গ্রাম থেকে কলকাতায় আসার পর ফুটবলটা ঠিক কীভাবে খেলে কিংবা খেলা উচিত, সেই শিক্ষা প্রথম পাই অমল দত্তের কাছ থেকে। পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতীয় ফুটবলে অমল দত্ত অতিপরিচিত এক নাম। শৈশব-কৈশোরে স্রেফ ওটুকুই জানা ছিল। পরে তিনি কলকাতার বড় দলগুলোর কোচ হয়েছিলেন। সাফল্য-ব্যর্থতা দুয়েরই স্বাদ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারও অনেক আগে, আমরা যখন কিশোর, সেই সময় অমল দত্ত পাড়ার ক্লাবগুলোতে যোগাযোগ করতেন। সামান্য অর্থের বিনিময়ে তিনি দেখাতেন, ফুটবলটা আদতে কেমন খেলা। কীভাবে ওই খেলাটা খেলতে হয়।
একটা ভাঙাচোরা গাড়ি ছিল তাঁর। সেই গাড়িতে একটা ৮ মিলিমিটারের প্রজেক্টর নিয়ে তিনি ক্লাবের মাঠে আসতেন। সঙ্গে থাকত সাদা স্ক্রিন টানটান করে টাঙানোর জন্য দুটো দণ্ড। নিজের পয়সা খরচ করে বিশ্ব ফুটবলের বড় নায়কদের খেলার ক্লিপিং কিনতেন। সাদা-কালো সেই ক্লিপিংগুলোয় ভেসে উঠত পেলে, দিদি, ভাভা, গারিঞ্চা, ডি স্টেফানোদের খেলা।
হাতে একটা মাইক্রোফোন নিয়ে ধারাভাষ্য দিতেন অমল দত্ত। ক্লিপিংগুলো বারবার চালিয়ে দেখাতে দেখাতে বোঝাতেন ফুটবল খেলাটা ওই দিকপালদের কাছে কতটা সহজ। কোনটা কোন মুভ, কোন ফরমেশন কী বলে, ট্যাকল কেমন হবে যাতে রেফারিকে বাঁশি বাজাতে না হয়, অ্যান্টিসিপেশনের গতি কেন চিতার মতো হতে হয়, এসব কথা উঠতি ফুটবলারদের পাখি-পড়ার মতো করে বোঝাতেন। ঘণ্টা দেড়েকের শো শেষ হয়ে গেলে মাঠ যখন ফাঁকা হয়ে যেত, গলদঘর্ম অমল দত্ত যখন পাততাড়ি গোটাতেন, তখন তাঁকে দেখে কেন যেন মনে হতো ফুটবলের এক সন্ন্যাসী। ফুটবল ছাড়া এই জগৎ-সংসারে ধ্যান-জ্ঞান বলে আর যেন কিছু নেই!
১৭ বছরের একটা ছেলে বিশ্বকাপের আসরে কী করে কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারেন, অমল দত্তের সৌজন্যে সেই প্রথম দেখা। তত দিনে আমার বয়সী তো বটেই, বড়দের কাছেও পেলেই হলেন ফুটবলের প্রথম ও শেষ কথা। ছবি তখনো সাদা-কালো। আবছা। ক্যামেরার কারসাজি কী জিনিস, আজকের মতো এক একটা মুভ কিংবা গোল তখন আট দিক থেকে ছেঁকে ধরা ক্যামেরায় দেখানোর প্রশ্নই ছিল না। স্লো মোশন ব্যাপারটাই–বা কী, সেই যুগে কল্পনায়ও তা আমাদের মনে টোকা মারেনি। চোখে কিছুটা দেখা না-দেখা গল্পগুলো বারবার শুনতে শুনতে পেলে-গারিঞ্চারা কেমনভাবে যেন অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন। বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল দেওয়া ব্রাজিলীয় ফুটবলে সেই যে সাঁতরানো শুরু, আজও তা থেকে মুক্ত হওয়া গেল না!
কেন গেল না, তা বুঝলাম ১৯৯১ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় ‘আর্থ সামিট’ কভার করার সময়। সেটা ছিল কল্পনার এক সফর। ১৮০টি দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানেরা পরিবেশ নিয়ে যখন মাথা ঘামাচ্ছেন, আমি তখন মারাকানা স্টেডিয়ামে দেখে চলেছি ব্রাজিল ন্যাশনাল লিগে একটার পর একটা খেলা।
টানা দুই সপ্তাহ ছিলাম ফ্ল্যামেঙ্গোয়। যেদিন ফ্ল্যামেঙ্গোর খেলা থাকত, সান্তোস অথবা ভাস্কোর সঙ্গে, সকাল থেকে গোটা তল্লাট মুড়ে যেত ফ্ল্যামেঙ্গোর লাল-কালো পতাকায়। পাড়ায় পাড়ায়, মোড়ে মোড়ে প্রিয় দলের জার্সি গায়ে ছেলেমেয়েদের জটলা শুরু হতো সাতসকাল থেকে। দুপুর থেকে বইতে থাকত স্টেডিয়ামমুখী জনতার স্রোত। সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে তাদেরই একজন হয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকতাম। তাদের প্রিয় ক্লাবের জন্য গলা ফাটাতাম। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
জিতলে শুরু হতো রাতভর হল্লা। কোপাকাবানা সৈকতে সকাল থেকে সেই যে ফুটবলের আসর বসতে দেখতাম, রাতেও তার বিরাম থাকত না। আলোয় ঝলমল করা সৈকতে বিচ ফুটবল আর বিচ ভলিবল চলত গভীর রাত পর্যন্ত। ব্রাজিলে না গেলে বোঝা যেত না, ফুটবল, শুধু ফুটবলই কেন তাদের ধর্ম।
অমল দত্তের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়। তাঁরই সৌজন্যে পেলে-গারিঞ্চা-দিদি-ভাভা-টোস্টাওদের জানাচেনা। তাঁদেরই কল্যাণে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সঙ্গে সেই যে প্রেমের শুরু, ক্রমেই তা হয়ে দাঁড়াল তরতরিয়ে তরণি বাওয়া। ব্রাজিল থেকে ফেরার পর কলকাতার সাউথ ক্লাবে একদিন চুনী গোস্বামীর সঙ্গে দেখা। তাঁর প্রথম বাক্যটাই ছিল, তাহলে তীর্থ দর্শন করে এলে?
সেই দিন চুনীদা ব্রাজিলের সঙ্গে বাঁধা গাঁটছড়ায় নতুন একটা গিঁট মেরে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘তারাই টিকে থাকে, যাদের একটা ঘরানা আছে। ব্রাজিলের ফুটবল অমর কেন জানো? লাতিন আমেরিকার ফুটবল-দর্শনের ধারাবাহিকতা তাদের মতো আর কেউ বহন করতে পারেনি বলে। আর্জেন্টিনা, পেরু, উরুগুয়ে, চিলি, বলিভিয়া কিংবা মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, প্যারাগুয়ে—কোনো দেশের ফুটবলই ব্রাজিলের মতো ধারাবাহিক নয়।’
কথাটা খুব ভাবিয়েছিল। সেই দিন তো বটেই, তারপর থেকে যতবার বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসেছে, ওই ‘ঘরানা’ শব্দটা মনে ঢেউ তুলে গেছে। ভেবে দেখেছি, সত্যিই তো, একমাত্র ব্রাজিলের ফুটবলই যেন অবাধ্য ঝরনার মতো। বাধাহীন সেই গতি। গারসন-পেলে-গারিঞ্চাদের হাত ধরে যার শুরু, ক্রমেই সেই ঘরানার ব্যাটন জিকো, সক্রেটিস, কার্লোস আলবার্তো, রিভেলিনো, রোমারিও, দুঙ্গা, রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদো, জর্জিনহো, জুনিয়র, রবার্তো কার্লোসদের হাতবদল হয়ে নেইমারে এসে থেমেছে।
কথাটা খুব ভাবিয়েছিল। সেই দিন তো বটেই, তারপর থেকে যতবার বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসেছে, ওই ‘ঘরানা’ শব্দটা মনে ঢেউ তুলে গেছে। ভেবে দেখেছি, সত্যিই তো, একমাত্র ব্রাজিলের ফুটবলই যেন অবাধ্য ঝরনার মতো। বাধাহীন সেই গতি। গারসন-পেলে-গারিঞ্চাদের হাত ধরে যার শুরু, ক্রমেই সেই ঘরানার ব্যাটন জিকো, সক্রেটিস, কার্লোস আলবার্তো, রিভেলিনো, রোমারিও, দুঙ্গা, রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদো, জর্জিনহো, জুনিয়র, রবার্তো কার্লোসদের হাতবদল হয়ে নেইমারে এসে থেমেছে।
একের পর এক তারকা ব্রাজিল ফুটবলের ঘরানার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। ঘরানা আছে বলেই চার বছর আগে জার্মানদের কাছে ক্ষমাহীন আত্মসমর্পণের পর ব্রাজিলীয় ফুটবল নেইমারের কাঁধে ভর দিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে। ইউরোপ, আফ্রিকা তো দূরের কথা, লাতিন আমেরিকার আর কোনো দেশও বছরের পর বছর ধারাবাহিকতার এমন নজির রাখতে পারেনি। আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা ক্ষণজন্মা, মেসিও তাই। কিন্তু ব্রাজিলীয় ফুটবলের ধারাবাহিকতার মতো তাঁরাও পারেননি ঘরানার জোয়াল এক কাঁধ থেকে অন্য কাঁধে চাপিয়ে ব্রাজিলের মতো এগিয়ে যেতে।
নেইমারদের নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছে ২১ কোটি ব্রাজিলিয়ান। তাদেরই সঙ্গে আমারই মতো হয়তো আরও ২১ কোটি ফুটবলপ্রেমী ভারতীয় অপলক চেয়ে থাকবে টিভির পর্দায়, সরষে ফুলের রঙে চোখ ধাঁধাতে। নেইমারদের পারতেই হবে। ফোটাতে হবে ফুটবলের ফুল। হার-জিত সে তো ক্ষণিকের চমক অথবা পলকের ভুল। চিরন্তন হলো ঘরানা। ফুটবলের সেই ঘরানার টানেই ব্রাজিলের পথ চেয়ে বসে থাকা।
নেইমারদের নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছে ২১ কোটি ব্রাজিলিয়ান। তাদেরই সঙ্গে আমারই মতো হয়তো আরও ২১ কোটি ফুটবলপ্রেমী ভারতীয় অপলক চেয়ে থাকবে টিভির পর্দায়, সরষে ফুলের রঙে চোখ ধাঁধাতে। নেইমারদের পারতেই হবে। ফোটাতে হবে ফুটবলের ফুল। হার-জিত সে তো ক্ষণিকের চমক অথবা পলকের ভুল। চিরন্তন হলো ঘরানা। ফুটবলের সেই ঘরানার টানেই ব্রাজিলের পথ চেয়ে বসে থাকা।
No comments:
Post a Comment