সকলের উদ্দেশ্যে কিছু নসিহা
(১). যে দাওয়াতে কুরআন কারীম ও সুন্নাহর চেয়ে অন্য কিছুর (যেমন বুদ্ধিবৃত্তির) ভূমিকা বা প্রভাব বেশি থাকে, সেটা হতে পারে সাময়িক উপায়। আপতকালীন অবলম্বন। যদি এমন দেখা যায়, অন্য কিছুর দিকে হাঁটতে গিয়ে আমি দিনদিন কুরআন-সুন্নাহ থেকেই দূরে সরে গেলাম, তাহলে নব্য মুতাযিলি সৃষ্টি হওয়ার পথ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়ে যায়। প্রথম প্রজন্ম না হলেও পরের প্রজন্মে। তাই বলে কি যুক্তি-তর্ক দিয়ে বোঝানোর মেহনত বন্ধ করে দিতে হবে?-উঁহু!
.
(২) যত যুক্তিই দেয়া হোক, মানবীয় যুক্তিতে দাসপ্রথাকে কোনওভাবেই বৈধ বলে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের ‘মালিক’ থাকবে? ইসলাম চাইলে অন্য আর সব কিছুর মতো এটাকেও চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারত। কিন্তু এটাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে গিয়ে, বলা হয়,
ইসলাম দাসপ্রথাকে নিরুৎসাহিত করেছে,
দাসের প্রতি সদাচার করতে বলা হয়েছে।
-এতই যখন করা হল, নিষিদ্ধ করে দিলেই পারত!
-ভবিষ্যতের কথা ভেবে এটা করা হয়নি!
-ভবিষ্যতে কী হবে না হবে, সেটা ধর্ম-অবিশ্বাসী মানবে কেন?
আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্যে বলা হয়,
অন্যধর্মে দাসদের কী অবস্থা ছিল,
পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল,
বিভিন্ন সভ্যতায় প্রথাটা কত অমানবিক ছিল,
ইসলাম এসে প্রথাটিকে কতটা সুন্দর মানবিক করে তুলেছে,
দাসত্বের সব রাস্তা বন্ধ করে শুধু একটি পথ খোলা রেখেছে,
বিভিন্ন উপলক্ষে দাসমুক্তির বিধান রেখে উৎসাহিত করা হয়েছে,
= সবই ঠিক আছে, কিন্তু আখের নিষিদ্ধ তো আর করে নি! এত কঠিন কঠিন প্রথা বিলুপ্ত করেছে, দাসপ্রথাকে পারল না?
যত কিছুই তুলে আনা হোক, ব্যাপারটা ঘুরেফিরে সেই আগের জায়গাতে গিয়েই ঠেকবে, মানবীয় যুক্তিতে ব্যাপারটা বুঝতে কষ্ট লাগবে:
-কেন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের অধীন থাকবে? এভাবে? বড়জোর চাকুরিতে অধীন থাকতে পারে, তাই বলে ‘মালিকানা? আর ইসলামি রাষ্ট্রে যারা যিম্মি, তারাও ‘দাস’ রাখতে পারে। তার মানে, দাসদাসীর বিধানের বৈধতায় এমন একটা বিষয় আছে, যা মানবীয় বোধের অতীত।
-কেন ইসলাম তো দাসমুক্তির প্রতি উৎসাহিত করেছে, সদাচারের আদেশ করেছে?
-আবারও সেই আগের জায়গায় ফিরে আসতে হচ্ছে!
.
মোটকথা হল, দাসপ্রথার ব্যাপারে ‘মুমিনকে’ একটা কথাই সবার আগে মনে রাখতে হবে,
-দাসদাসীর বিধান বৈধ, কারণ আল্লাহ তা‘আলা এই বিধান দিয়েছেন। কুরআন কারীম এটাকে বৈধ বলে। আজো। এখনো। নবী সা. এটাকে বৈধ বলে গেছেন। চোখমুখ বুজে প্রথমে এটা বিশ্বাস করে নিতে হবে।
-তার মানে কি, এই প্রথার যৌক্তিকতা নিয়ে অন্যদের আপত্তিগুলো খণ্ডন করব না?
-অবশ্যই অবশ্যই করতে হবে। আমরা বলতে চাচ্ছি, যত যাই করা হোক, প্রথমে ও শেষে লেখক-পাঠক উভয়ের মাথাতেই আগের কথাটা রাখা জরুরি: এটা ওহী দ্বারা সাব্যস্ত। ওহীর প্রধান ভূমিকাই হল ‘গাইবের প্রতি বিশ্বাস’। না দেখেই বিশ্বাস করে ফেলা। কোনও যুক্তিতর্ক ছাড়া। দাসদাসীর বিধানটা বৈধ, এই আকীদা পোষণ করার সাথে সাথে যদি এটাও মাথায় থাকে,
-আমি এটা জেনেছি অমুক বই পড়ে! অমুক লেখকের লেখা পড়ে! এর আগে আমার মধ্যে খটকা ছিল!
ভাল, তবে আমরা একটু যোগ করতে চাই,
-আমার আকীদার জায়গাটাতে, অমুক বই বা অমুক লেখককে সরিয়ে কুরআন কারীম ও আল্লাহ তা‘আলাকে বসিয়ে দিতে হবে। এটা জরুরী।
-মানে?
-মানে হল, ওই বিধানটা কুরআন কারীমে আছে বলে, নবীজি বলেছেন বলে, আল্লাহ তা‘আলা হুকুম দিয়েছেন বলেই বৈধ। অমুক লেখকের কারণে নয়। হাঁ, অমুকের কারণে আমি বিষয়টা জেনেছি। কিন্তু যখন আমি বিশ্বাসের স্তরে উন্নীত হয়েই গেলাম, তখন মিডিয়ামের মূর্তি রাখার দরকার নেই। সরাসরি কুরআন কারীমে চলে আসা: বিধানটা কুরআন কারীমে আছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
আরেকটা ব্যাপারও পরিষ্কার করে রাখা জরুরী, আপনি অমুকের লেখা বিশ্বাস করেছেন, কারণ তিনিও কুরআন-সুন্নাহের আলোকেই লেখাটা লিখেছেন। ব্যতিক্রম হলে, আপনি সেটা ছুঁয়েও দেখতেন না।
আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল,
-আকীদাকে সরাসরি কুরআনে নিয়ে আসা। সব ধরনের মাধ্যম বাদ দিয়ে। সব ধরনের মিডিয়ামকে সরিয়ে। যাবতীয় যুক্তি-তর্ককে ছাড়িয়ে এ পর্যায়ে চলে আসা: আমার আল্লাহ এটা বলেছে,তাই এটা সত্য।
.
(৩) অবিশ্বাসী-সংশয়বাদীদেরকে ঈমান আনানোর চেষ্টায় কেউ কেউ এত বেশি মশগুল হয়ে যান, ইসলামকে একটা ‘নুলো’ ধর্মে পরিণত করতেও তাদের বাধে না।
তারা ইসলাম শুধু শান্তির ধর্ম,
কাফেরদের প্রতি ঘৃণা নেই।
দারুল হারব বলে কিছু নেই।
ওয়ালা-বারা বলে কিছু নেই।
কিতাল বলে কিছু নেই। থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে।
আরও অনেক কিছুকেই তারা নাই করে দিতে চান অথবা নরম করে দিতে চান। এটা বিপদজনক। এটা সবার ক্ষেত্রে প্রজোয্য না হলেও কারও কারও জন্যে অবশ্যই প্রযোজ্য।
.
(৪) আর তাকদীর সম্পর্কিত বিষয় যত কম অবতারাণ করা যায়, ততই ভাল।
.
আবারও বলি, আমাদের আকীদা হবে কুরআন-সুন্নাহনির্ভর। সংশয়বাদীদের খণ্ডন করে লেখা বইগুলো সংশবাদীরা কতটা পড়ে জানা নেই, তবে এসব বইয়ের বেশিরভাগ পাঠক-ই-যে মুমিন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মনে যাতে ধীরে ধীরে,
ক. ওহীকে যুক্তি দিয়ে বিচার করার প্রবণতা গড়ে না ওঠে,
খ. সবকিছু যুক্তি দিয়ে বুঝতে হবে, এমন মানসিকতা গড়ে না ওঠে,
গ. লক্ষ বইয়ের চেয়ে একটা আয়াত কোটিগুণের চেয়েও বেশি শক্তিশালী, এটা যেন সামনে থেকে সরে না যায়,
ঘ. আকীদা ঠিক রাখতে হলে কুরআন যথেষ্ট নয়, অন্য বইও পড়তে হবে, এমন চিন্তা যেন ঝেঁকে না বসে,
ঙ. আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, নবীজি সা. বলেছেন, কুরআন বলেছে, এসবকে ছাপিয়ে যাতে, অন্য কিছু বলেছে এই ‘মূর্তির মিডিয়াম’ আকীদাকে গ্রাস করতে না পারে,
চ. যুক্তিকে কুরআন-সুন্নাহ দিয়ে যাচাই করাকে চাপিয়ে, কুরআন-সুন্নাহকে যুক্তির আলোকে বিচার করার প্রবণতা যেন না বাড়ে,
ছ. সংশয়বাদীদেরকে বোঝাতে, সালাফকে পাশ কাটিয়ে, কুরআন-সুন্নাহর মনগড়া তাফসীর করার ধ্বংসাত্মক প্রবণতা যেন না বাড়ে,
.
(৫). ইসলামি বিধানকে, সুন্নাহকে বিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করার প্রবণতা। এটা মারাত্মক সব ভ্রান্তির জন্ম দেয়।
-তাহলে কি এটা খারাপ?
-জি¦ না, খারাপ নয়। অবশ্যই ব্যবহারিক সুন্নাহকে বিজ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা চলতে পারে। তবে না করে থাকতে পারলে ভাল। তীব্র প্রয়োজনে করা যেতে পারে। কিন্তু এর একটা পাশ্ব প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে খেয়াল রাখা দরকার,
ক. এ-চর্চার ধারা অব্যাহত থাকলে, পাঠকের মনে ‘বিজ্ঞান’কে মানদণ্ড বা কষ্টিপাথর’ ভাবার একটা অশুভ প্রবণতা তৈরী হয়ে যেতে পারে। একটা সুন্নাহ দেখলেই, তার মনে প্রশ্ন উদয় হবে, বিজ্ঞান এ-ব্যাপারে কী বলে? সবার না হলেও কারও কারও হতে পারে।
খ. এসবের পেছনে পড়লে, হেদায়াতের দিকটা গৌণ হয়ে পড়ে। না না, প্রথম প্রজন্মের কথা বলছি না, পরের প্রজন্মের কথা বলছি। সুন্নাতে রাসূল ও আধুনিক বিজ্ঞান বইয়ের সুফল অবশ্যই আছে, কিন্তু কুফলও-যে একেবারে নেই, তা উড়িয়ে দেয়া যায় না। দ্বীন বোঝার জন্যে, বিজ্ঞান অপরিহার্য নয়, ক্ষেত্রবিশেবে সহায়ক হতে পারে।
তার মানে এই নয়, সুন্নাহকে যুগের আলোকে, বিজ্ঞানের মানদণ্ডে মেপে দেখা আদপেই বন্ধ করে দিতে হবে। এটা আমরা বলছি না, আমরা শুধু সচেতন থাকার আবেদন করছি।
.
সংশয়বাদ বিরোধী মেহনত চলুক। হেকমত ও মাওইযায়ে হাসানাহর আয়াত মেনে।
পাশাপাশি সরাসরি কুরআনে, সুন্নাহয় সরাসরি সমর্পিত হওয়ার মেহনতও চলতে থাকুক। প্রথমটা সাময়িক উপশম, পরেরটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
.
একটা কথা মনে রাখা দরকার, যতবেশি বই-ই লেখা হোক, বিশ্বে নাস্তিকতার হার দিন দিন বেড়েই চলছে। চলবেই। এটাকে রোধ করা যাবে না। নাস্তিকরা বই পড়ে ঈমান আনে না। তাদের সামনে আকাশ ভেঙে ফেললেও, তারা বিশ্বাস করবে না, এটা কুরআনের কথা। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে, তারা যুক্তিতে পরাস্ত হয়ে আনে না, আনে আকস্মিক কোনও ‘ঘটনা’ বা বোধোদয়ে। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে অাসা তার প্রতি বিশেষ রহমত। হাঁ, যুক্তির ভূমিকাও কিছুটা থাকে।
.
কেউ কেউ বলবেন, ধার্মিকের সংখ্যাওতো দিন দিন বাড়ছে?
জ্বি, বাড়ছে, তবে সেই বাড়াটা এমন সমাজে ঘটছে, যা নাস্তিকতা প্রভাবিত। যার প্রভাবে ইসলামের মূল রূপ আড়ালে চলে গেছে। সালাত-সিয়াম দাড়ি-টুপি-হিজাবকেই ইসলামের চূড়ান্ত রূপ বলে ধরে নিচ্ছে। এর বাইরে ‘ইলায়ে কালিমাতুল্লাহ, বা আল্লাহর কালিমাকে আল্লাহর যমীনে বুলন্দ করার প্রতি বেশির ভাগেরই কোনও আগ্রহ নেই। ব্যতিক্রমও আছে। তবে সেটা নিতান্তই গৌণ।
.
যুক্তির মেহনতের প্রধান লাভ কী? সংশয়ে পড়ে যাওয়া মুমিন তার হারানো আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়।
.
যুক্তির মেহনত চলুক পুরোদমে।
কুরআনে সমর্পনও থাকুক।
.
লিখেছেনঃ শায়েখ Atik Ullah
No comments:
Post a Comment